Category: ধর্ম

  • তরুণ-তরুণীর বন্ধুত্ব নিয়ে ইসলাম কী বলে

    তরুণ-তরুণীর বন্ধুত্ব নিয়ে ইসলাম কী বলে

    ধর্ম  ডেস্ক:     ইসলাম মানবিক সম্পর্ককে অনুমোদন করলেও, তরুণ-তরুণীর অবাধ মেলামেশা বা ‘স্মার্ট বন্ধুত্বে’ নৈতিকতার সীমানা টেনেছে। নির্জনতা ও অপ্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠতা থেকে বিরত থাকতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

    আধুনিকতার ঝলকে এই সম্পর্কগুলো দেখতে যতই সুন্দর লাগুক, এর অন্তরালে লুকিয়ে থাকে এক সূক্ষ্ম নৈতিক সংকট। প্রশ্নটা জাগে ইসলাম এই বন্ধুত্বকে কীভাবে দেখে? ইসলাম মানবিক সম্পর্ককে সীমাবদ্ধ করে না, বরং তা পরিশুদ্ধতার আলোয় স্নাত করতে শেখায়।

    আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন দৃষ্টি নত রাখে ও লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।’ (সুরা আন-নূর, আয়াত ৩০)এবং নারীদের উদ্দেশে একই আদেশ, ‘মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন দৃষ্টি নত রাখে, লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে এবং নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।’ (সুরা আন-নূর, আয়াত ৩১)

    এই আয়াতদ্বয় আসলে সম্পর্কের এক দার্শনিক সীমানা টেনে দেয় যেখানে শালীনতা হচ্ছে আত্মার বর্ম, আর সংযম হচ্ছে চরিত্রের অলংকার। রাসুলুল্লাহ সা. সতর্ক করে বলেছেন, ‘যখন কোনো নারী ও পুরুষ নির্জনে অবস্থান করে, তখন তাদের তৃতীয় জন হয় শয়তান।’ (তিরমিজি, হাদিস ১১৭১) অতএব, ইসলাম বন্ধুত্ব নিষিদ্ধ করেনি, কিন্তু সীমাহীন বন্ধুত্বের দরজায় স্পষ্টভাবে ‘সতর্কতা’র সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছে।

    ইমাম ইবনু কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, ‘নারী–পুরুষের অপ্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠতা হৃদয়ের রোগ সৃষ্টি করে, যা পাপের দ্বার উন্মুক্ত করে।’ (আল–জাওয়াবুল কাফি, পৃ. ১২৪) ইমাম নববী (রহ.) মন্তব্য করেন, ‘যে সম্পর্ক মানুষকে আল্লাহর স্মৃতি থেকে দূরে নিয়ে যায়, তা বন্ধুত্ব নয়, বরং তা ফিতনার সূচনা।’ আজকের তথাকথিত ‘স্মার্ট বন্ধুত্ব’ বা ‘বেস্ট ফ্রেন্ড কালচার’ অনেক সময় আবেগের জোয়ারে গুনাহের স্রোতে পরিণত হয়। মোবাইল স্ক্রিনের আড়ালে জন্ম নেয় এমন সম্পর্ক, যা শুরু হয় নিরীহ কথোপকথনে—শেষ হয় আত্মিক শূন্যতায়। ইসলাম এই ঝুঁকি থেকে বাঁচার জন্যই শালীনতা ও সংযমের কঠোর বিধান দিয়েছে।

    তবে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে ইসলাম কোনো কাল্পনিক বিচ্ছিন্নতা চায় না। শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র বা সামাজিক দায়িত্বে নারী–পুরুষের সহযোগিতা হতে পারে, কিন্তু তা যেন উদ্দেশ্যনির্ভর, সম্মাননির্ভর এবং সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে। বন্ধুত্ব তখনই পবিত্র, যখন তা আত্মার উন্নতি ঘটায়, নয়তো তা পরিণত হয় আত্মপ্রবঞ্চনায়।

    আজকের তরুণ প্রজন্মের জন্য এটাই ইসলামের বার্তা,অন্যের হৃদয় নয়, নিজের নৈতিকতাকে জয় করো। বন্ধুত্ব নয়, ভ্রাতৃত্বই ইসলামের ভাষা; যেখানে সম্পর্কের ভিত্তি আবেগ নয়, ঈমান।

    লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর

  • দেনমোহর পরিশোধ না করলে স্ত্রীর সঙ্গে থাকা জায়েজ?

    দেনমোহর পরিশোধ না করলে স্ত্রীর সঙ্গে থাকা জায়েজ?

    অনলাইন ডেস্ক:      শরীয়তসম্মত পন্থায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর স্বামীর জিম্মায় একটি যৌক্তিক বিনিময় নির্ধারিত হয়, যাকে ফিকহের পরিভাষায় মোহর বলে।মোহর আদায় করা স্বামীর অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। বিয়েতে নারীর জন্য মোহরের অধিকার নির্ধারণ এবং তাতে নারীর পূর্ণ মালিকানা প্রদান ইসলামের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।এটা ঠিক যে, একজন নারী মোহর বাবদ যে সম্পদ লাভ করেন তা দাম্পত্য জীবনে তার নিঃস্বার্থ সেবার প্রকৃত বিনিময় হতে পারে না। তবে তা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে হৃদ্যতা ও ভালবাসা সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।মোহরের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। এটা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে পুরুষের ইচ্ছা ও সঙ্গতির উপর। তাই সামর্থ্যবান পুরুষ যদি নিজের স্ত্রীকে কয়েক লক্ষ টাকাও মোহর হিসেবে প্রদান করেন তাতে কোনো বাধা নেই।

    কুরআন মজীদ থেকে মোহর বাবদ ‘প্রভূত সম্পদ’ দেওয়ার বৈধতা পাওয়া যায়। (সুরা নিসা : ২০)বিয়ের আকদ ও মোহর নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্ত্রীর সম্মতি অপরিহার্য। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অনেক মুসলমান এই ফরজ আদায়ের বিষয়ে চরম উদাসীন।বিয়ের সময় বৈধ-অবৈধ উৎসব-আয়োজন ও অপ্রয়োজনীয় ধুমধাম করে লাখ লাখ টাকা অপচয় করলেও মোহর আদায়ে চরম অবহেলা করা হয়!

    মোহর কখন আদায় করবে

    বিয়ের সঙ্গে সঙ্গেই মোহর আদায় করে দেওয়া উচিত। তবে যদি অনিবার্য কারণে ওই সময় তা আদায় করা সম্ভব না হয় তাহলে কখন আদায় করা হবে তার মেয়াদ নির্ধারিত করে নিতে হবে।কিন্তু এভাবে পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ না করে শুধু মৌখিকভাবে বা কাগজে-কলমে মোহর নির্ধারণ করে সারা জীবন আদায় না করা, বা স্ত্রীর কাছ থেকে মাফ করিয়ে নেওয়া, কিংবা আদায় না করে স্ত্রীর দেনা কাঁধে নিয়ে মৃত্যুবরণ করা শুধু যে ইসলামের বিধানে কঠিন অন্যায় তা-ই নয়; নিতান্ত হীন ও কাপুরুষোচিত কাজও বটে।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথাসম্ভব আকদের সময়ই মোহর পরিশোধ করার, অন্তত কিছু অংশ আদায় করার তাকিদ করেছেন। এক সাহাবি বিয়ের আগ্রহ প্রকাশ করলে নবীজী তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মোহর আদায় করার জন্য তোমার কাছে কী আছে?’ তিনি কিছুই নেই জানালে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘যাও একটি লোহার আংটি হলেও জোগাড় কর!’ (বুখারি )এ থেকে মোহরের গুরুত্ব ও নগদ আদায়ের তাগিদ স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।

    দেনমোহর পরিশোধ না করলে স্ত্রীর সঙ্গে থাকা জায়েজ

    মোহর নগদ আদায় না করলেও বিবাহ শুদ্ধ হবে ঠিক, তবে পরে আদায়ের মেয়াদ নির্ধারিত করে নিতে হবে। কিন্তু কেউ যদি তাও না করে তাহলে শরীয়ত স্ত্রীকে এ অধিকার দিয়েছে যে, মোহর উসূল না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রী নিজেকে স্বামীর হাতে অর্পণ করা থেকে বিরত থাকতে পারবে এবং ওই অবস্থাতেও স্বামীকে স্ত্রীর ব্যয়ভার নিয়মিত বহন করতে হবে।

    কারণ স্ত্রীর ভরণ-পোষণ এবং মোহর সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। স্ত্রী অবাধ্য হলেই কেবল স্বামী তার ভরণ-পোষণ বন্ধ করতে পারে। যে মোহরের মেয়াদ নির্ধারিত হয়নি তা তলব করা তো স্ত্রীর বৈধ অধিকার। একে অবাধ্যতা বিবেচনা করে স্ত্রীর নিয়মিত ব্যয়ভার বন্ধ করার অধিকার স্বামীর নেই।

    ফুকাহায়ে কেরাম স্পষ্ট ভাষায় এ মাসআলা বলেছেন যে, স্বামী মোহর আদায় করে স্ত্রীকে নিজের বাড়ি নিয়ে যেতে পারবে। যদি (মোহর আদায় না করে নিয়ে যেতে চায়, আর) স্ত্রী মোহর দাবি করে নিজ ঘরে অনড় থাকে, তাহলেও স্ত্রী (মোহর তো পাবেই, উপরন্তু) নিয়মিত ভরণ-পোষণ পাওয়ার হকদার থাকবে। কারণ সে তার ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায়ের স্বার্থেই বাড়ি যাচ্ছে না। (নাফাকাত অধ্যায়)

    মোহর উসুল না হওয়া পর্যন্ত স্বামীকে যৌনসম্পর্ক স্থাপন, এমনকি চুম্বন-আলিঙ্গন ইত্যাদি থেকে বাধা দেওয়া এবং স্বামীর সঙ্গে সফরে যেতে অস্বীকার করার অধিকারও স্ত্রীর রয়েছে। (দুররে মুখতার)উপরের বিবরণ থেকে স্পষ্ট হল যে, মোহর একজন স্ত্রীর শরীয়ত কর্তৃক প্রদত্ত অধিকার। কুরআন ও হাদিসে সুস্পষ্ট ভাষায় তা আদায়ের তাকিদ এসেছে।

    এসব তাকিদ উপেক্ষা করে কেউ যদি মোহর আদায়ে টালবাহানা করে কিংবা একেবারে আদায় না করারই নিয়ত করে তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে সে ব্যাভিচারী হিসেবে গণ্য।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, মোহর আদায় না করার নিয়তে কেউ যদি কোনো নারীকে বিয়ে করে। আর আল্লাহ তাআলা ভালো করেই জানেন যে, তার মোহর আদায়ের নিয়ত নেই তাহলে সে আল্লাহ তাআলাকে ধোঁকা দেওয়ার স্পর্ধা দেখাল এবং অন্যায়ভাবে নারীর লজ্জাস্থান ভোগ করল। কেয়ামতের দিন সে ব্যভিচারীরূপে উপস্থিত হবে। (আহমদ)

    আল্লাহ তাআলার নিকট অত্যন্ত ভয়ানক একটি পাপ এই যে, কোনো নারীকে বিয়ে করে নিজের চাহিদা পূরণের পর তাকে তালাক দিয়ে দেওয়া এবং মোহর আদায় না করা।

    হাদিসে আরো বলা হয়েছে, তোমাদেরকে কেয়ামতের দিন অবশ্যই হকদারের হক পরিশোধ করতে হবে। এমনকি (শিংধারী কোনো ছাগল শিংবিহীন ছাগলকে অন্যায়ভাবে গুঁতা মেরে থাকলে) শিংবিহীন ছাগলের সামনে শিংধারীকে উপস্থিত করে বদলা নিতে দেওয়া হবে।

  • ইসলামে মানুষের অধিকার রক্ষার গুরুত্ব

    ইসলামে মানুষের অধিকার রক্ষার গুরুত্ব

    অনলাইন ডেস্ক:   ইসলামী শরিয়তের আমলসমূহ প্রধানত দুই ধরনের। একটি হলো আল্লাহর হক, অন্যটি বান্দা বা মানুষের হক। এই দুই ধরনের আমলের মধ্যে আল্লাহ এবং তার রাসুল (সা.) কতৃক যেগুলো আবশ্যক করা হয়েছে সেগুলো ফরজ, এবং যে কাজগুলো নিষেধ করা হয়েছে বা যেগুলো করলে পরকালে শাস্তির কথা ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলো হারাম।

    ইসলামের ফরজ বিষয় এবং হারাম বিষয়সমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অল্পকিছু আমল শুধুমাত্র আল্লাহর হক। আর বাকি অধিকাংশ বিষয়গুলো মানুষের হক বা মানুষের সাথে জড়িত। নিম্নে বিশ্লেষণ করা হলো:

    ইসলামের ভিত্তিসমূহ

    আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই, আর মুহাম্মাদ (সা.) তার বান্দা ও রাসুল- এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা, সালাত কায়েম করা, জাকাত দেয়া, বায়তুল্লাহর হজ্জ করা ও রমজানের সিয়াম পালন করা। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১)

    এখানে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যকার কাজগুলো বিশেষত আল্লাহর হক সম্পর্কিত। কিন্তু জাকাত আদায় করাটা বান্দার সাথেও সরাসরি সম্পর্কিত। এগুলো ব্যতীত অন্য সকল শ্রেষ্ঠ বা নিকৃষ্ট আমলের সাথে মানুষের হক বা মানুষের সাথে সদাচরণ ও অসদাচরণের সম্পৃক্ততা রয়েছে।

     সর্বোত্তম মানুষ যারা

    ইসলাম সর্বোচ্চ মানুষের অধিকার রক্ষার তাগিদ নির্দেশ দেয়। রাসুল (সা.) বিভিন্ন হাদিসে সর্বোত্তম মানুষ বা সর্বোত্তম মুসলিমের পরিচয় তুলে ধরেছেন। আর এগুলোর অধিকাংশই মানবাধিকার বা মানবকল্যাণ সংশ্লিষ্ট।

    ক. উত্তম চরিত্র

    আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যার স্বভাব-চরিত্র উত্তম, সেই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৩৫)

    খ. অপর মুসলিমের নিরাপত্তা

    রাসুল (সা.) বলেন, যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমগণ নিরাপদ থাকে সে ব্যক্তিই প্রকৃত মুসলিম। আর যাকে মানুষ তাদের জান ও মালের জন্য নিরাপদ মনে করে সে-ই প্রকৃত মু’মিন। (তিরমিজি, হাদিস : ২৬২৭)

    গ. ক্ষুধার্তকে খাওয়ানো এবং সালামের প্রসার

    আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করল, ইসলামে সর্বোত্তম কাজ কী? তিনি বললেন, (ক্ষুধার্তকে) অন্নদান করবে এবং পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে সকলকে (ব্যাপকভাবে) সালাম দেবে। (রিয়াদুস সালেহিন : ৮৪৯)

    অর্থাৎ, মানুষের সাথে সদাচার সর্বোত্তম মুসলিম হওয়ার উপায়।

    ধ্বংসকারী সাত গুনাহ

    রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি হাদিসে ধ্বংসকারী সাতটি হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকতে বলেছেন। যার মধ্যে অধিকাংশই মানুষের হক জড়িত।

    আবূ হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ধ্বংসকারী সাতটি কাজ থেকে তোমরা বেঁচে থেকো। প্রশ্ন করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল সেগুলো কী?

    তিনি বললেন আল্লাহর সাথে শারীক করা, জাদু করা, আল্লাহ যার হত্যা নিষেধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করা, এতিমের মাল অন্যায়ভাবে আত্নসাৎ করা,  সুদ খাওয়া,  যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা এবং সাধ্বী, সরলমনা ও ইমানদার নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করা। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩)

    আত্মীয় ও প্রতিবেশীর হক

    ইসলাম রক্তের সম্পর্ক রক্ষার প্রতি সর্বোচ্চ নির্দেশনা দিয়েছে। পাশাপাশি এতিম, মিসকিন, প্রতিবেশী, পথচারী, দাসদাসী সকলের সাথে ভালো ব্যবহার আবশ্যক করেছে।

    রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রক্ত সম্পর্কে মূল হল রাহমান। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, যে তোমার সাথে সুসম্পর্ক রাখবে, আমি তার সাথে সুসম্পর্ক রাখব। আর যে তোমা হতে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আমিও সেই লোক হতে সম্পর্ক ছিন্ন করব। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৮)

    আল্লাহ তায়ালা ইবাদাত ও শিরকের ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়ার পরই বলেন, পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার কর। আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সঙ্গে বসা (বা দাঁড়ানো) ব্যক্তি, পথচারী এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতিও (সদ্ব্যবহার কর)। (সূরা নিসা : ৩৬)

    এতিম, বিধবা ও মিসকিনদের প্রতি সদয়

    জান্নাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)- এর সবচেয়ে কাছাকাছি থাকার উপায় হলো, এতিমের দেখাশোনা করা। সাহল ইবনু সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, আমি ও এতিমের দেখাশুনাকারী জান্নাতে এভাবে (একত্রে) থাকব। এ কথা বলার সময় তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুলদ্বয় মিলিয়ে ইঙ্গিত করে দেখালেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০০৫)

    এছাড়াও আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা.) বলেছেন, বিধবা ও মিসকীনদের অভাব দূর করার জন্য সচেষ্ট ব্যক্তি আল্লাহ্‌র পথে জিহাদকারীর ন্যায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০০৭)

    মানুষের প্রতি জুলুম করার পরিণতি

    কোনো মানুষের প্রতি জুলুম করাকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। যেমন, কারো অল্প পরিমাণ জমি জুলুম করে কেউ আত্মসাৎ করলে তাঁর পরিণতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, যে লোক এক বিঘত জমি অন্যায়ভাবে নিয়ে নেয়, (কিয়ামতের দিন) এর সাত তবক জমি তার গলায় লটকিয়ে দেয়া হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৫৩)

    মিথ্যা বলা, চুরি করা, গীবত করা, অপবাদ দেয়া, ঘুস খাওয়া, যিনা করা, হিংসা করা ইত্যাদি সবই মানুষের হক সংশ্লিষ্ট কবিরা গুনাহ। তাই প্রকৃত মুসলিম হওয়ার জন্য আল্লাহর হক আদায়ের পাশাপাশি মানুষের সকল প্রকার হক রক্ষায়ও সচেষ্ট থাকতে হবে।

    লেখক: শিক্ষার্থী, আল-হাদিস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

  • সব ধরনের ক্ষতি থেকে বাঁচার দোয়া

    সব ধরনের ক্ষতি থেকে বাঁচার দোয়া

    ধর্ম ও জীবন ডেস্ক: হিংসা, বদনজর, জাদু, শয়তানের কুপ্রভাব ও কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচতে সকাল ও সন্ধ্যায় তিন কুল অর্থাৎ সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস তিনবার করে পাঠ করুন। সুরা ইখলাসে আল্লাহর পরিচয়, একত্ব ও ক্ষমতা বর্ণনা করা হয়েছে। সুরা ফালাক ও সুরা নাসে জাদুর ক্ষতি, হিংসা ও বদনজরের ক্ষতি, শয়তানের ওয়াসওয়াসাসহ সব ধরনের বিপদ-আপদ থেকে আল্লাহ তাআলা তার আশ্রয় প্রার্থনা করতে শিখিয়েছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে খুবাইব (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) আমাকে বলেছেন, সকালে ও সন্ধ্যায় সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস তিনবার করে পড়ুন, এ আমল প্রতিটি (ক্ষতিকর) জিনিস থেকে নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট হবে। (সুনানে তিরমিজি, সুনানে আবু দাউদ)

    সুরা ইখলাস

    قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ – اللَّهُ الصَّمَدُ – لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ – وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ

    উচ্চারণ: কুল হুয়াল্লাহু আহাদ। আল্লাহুস-সামাদ। লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ। ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহু কুফুয়ান আহাদ।

    অর্থ: বলো, তিনিই আল্লাহ, একক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি, কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। তার সমতুল্য কেউ নেই।

    সুরা ফালাক

    قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ – مِن شَرِّ مَا خَلَقَ – وَمِن شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ – وَمِن شَرِّ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ – وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ

    উচ্চারণ: কুল আউজু বিরাব্বিল ফালাক্ব; মিন শাররি মা খালাক্ব; ওয়া মিন শাররি গাসিক্বিন ইজা ওয়াক্বাব; ওয়া মিন শাররিন নাফ্ফাছাতি ফিল উক্বাদ; ওয়া মিন শাররি হাসিদিন ইজা হাসাদ।

    অর্থ: বলো আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঊষার রবের কাছে; তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে, অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট থেকে যখন তা সমাগত হয়, গ্রন্থিতে ফুৎকার দিয়ে জাদুকারিণীদের অনিষ্ট থেকে, আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।

    সুরা নাস

    قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ – مَلِكِ النَّاسِ – إِلَهِ النَّاسِ – مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ – الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ – مِنَ الْجِنَّةِ وَ النَّاسِ

    উচ্চারণ: কুল আউজু বিরাব্বিন নাস; মালিকিন্ নাস; ইলাহিন্ নাস। মিন্ শররিল ওয়াস্ওয়াসিল খান্নাস; আল্লাজি ইউওয়াসয়িসু ফি ছুদুরিন নাস। মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস।

    অর্থ: বলো, আমি আশ্রয় চাই মানুষের রবের কাছে, মানুষের অধিপতির কাছে, মানুষের মাবুদের কাছে। তার অনিষ্ট থেকে, যে কুমন্ত্রণা দেয় ও আত্মগোপন করে, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে; জিন হোক বা মানুষ হোক।

  • টুপি না পরলে গুনাহ হবে কি!

    টুপি না পরলে গুনাহ হবে কি!

    ধর্ম  ডেস্ক:  প্রশ্ন: টুপি পরা কি সুন্নাত নাকি ফরজ, ওয়াজিব , না পরলে গুনাহ হবে কি না?

    উত্তর: টুপি শব্দটির বাংলা অর্থ হলো মস্তকাবরণ বিশেষ, শিরস্ত্রাণ। এটি মূলত সংস্কৃত শব্দ থেকে এসেছে। টুপির বহুল পরিচিত আরবি শব্দ হলো ‘কালানসুওয়া’। এটি ‘কালসুন’ থেকে উদ্গত, এর বহুবচন হলো ‘কালানিস’। ‘কালানসুওয়া’ অর্থ শিরোভূষণ।

    ফেকাহবিদ আলেমরা বলেন, একজন মুসলমান হিসেবে সবসময় টুপি পরা মুস্তাহাব এবং নামাজে পরা সুন্নত। টুপি মুসলিম পুরুষদের মাথায় শোভা পাওয়া ইসলামের অন্যতম একটি নিদর্শন। মুসলিম পুরুষেরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের সময় মাথায় টুপি পরিধান করেন। কুরআন তেলাওয়াত, কবর জিয়ারত এবং ধর্মীয় বিভিন্ন পবিত্র কাজ করার সময় মাথায় টুপি দেওয়া একটি স্বাভাবিক সংস্কৃতির অংশ।

    টুপি পরা সুন্নাত এবং মুসলিম উম্মাহর ‘শিআর’ জাতীয় নিদর্শন। হাদিসে, আছারে ও ইতিহাসের কিতাবে এ বিষয়ে বহু প্রমাণ আছে। যেমন,

    ১. হাসান বিন মেহরান থেকে বর্ণিত, একজন সাহাবি বলেছেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ সা.-এর সঙ্গে তার দস্তরখানে খেয়েছি এবং তার মাথায় সাদা টুপি দেখেছি’। (আল ইসাবাহ ৪/৩৩৯)

    ২. উমর ইবনে খাত্তাব রা. রাসুলুল্লাহ সা.-কে বলতে শুনেছেন, শহীদ হল তিন শ্রেণীর লোক: এমন মুমিন … এবং রাসুলুল্লাহ সা. মাথা তুললেন। তখন তার টুপি পড়ে গেল। অথবা বলেছেন উমরের টুপি পড়ে গেল। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৪৬ জামে তিরমিযী, হাদিস : ১৬৪৪)

    ৩. হাসান বসরী রহ. বলেন, তারা (সাহাবায়ে কেরাম গরমের দিনে) পাগড়ি বা টুপির উপর সিজদা করতেন। (সহিহ বুখারি, কিতাবুস সালাত)

    উল্লেখ্য, হাসান বসরী রহ. অনেক বড় মনীষী তাবেয়ী, যিনি অনেক সাহাবীকে দেখেছেন এবং তাদের সাহচর্য গ্রহণ করেছেন।

    ৪. সুলাইমান ইবনে আবি আবদিল্লাহ বলেন, আমি প্রথম সারির মুহাজিরগণকে দেখেছি তারা সুতির পাগড়ি পরিধান করতেন। কালো, সাদা, লাল, সবুজ, হলুদ ইত্যাদি রংয়ের। তারা পাগড়ির কাপড় মাথায় রেখে তার উপর টুপি রাখতেন। অতপর তার উপর পাগড়ি ঘুরিয়ে পরতেন।(মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ১২/৫৪৫)

    ফুকাহায়ে কেরাম নামাজে টুপি পরা সুন্নত বলেছেন এবং অবহেলা করে টুপি না পরে নামাজ পড়াকে মাকরুহ বলেছেন, যদিও নামাজ আদায় হয়ে যাবে। (ফাতাওয়া কাজিখান : ১/১৩৫)

    আলেমরা এ ব্যাপারে একমত, টুপি পরা মুস্তাহাব এবং চার ইমামের সবাই বলেন, নামাজ আদায়ের সময় টুপি পরিধান করা মুস্তাহাব আর অবহেলা করে টুপি পরিধান না করে নামাজ পড়া মাকরুহ, যদিও নামাজ আদায় হয়ে যাবে (ফাতাওয়ায়ে কাজিখান : ১/১৩৫; রদ্দুল মুখতার : ১/৬৪০; ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া : ১/৫৬৫)

    কোনো কারণ ছাড়া শেয়ারে ইসলাম তথা ইসলামের নিদর্শনে টুপি ছাড়া নামাজ আদায় করা মাকরূহ হবে।

    টুপি না থাকলে সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু সবসময়ই অলসতা করে টুপি ছাড়া নামাজ আদায় করা উচিত নয়। এটা মাকরূহ হবে। গুনাহগার হতে হবে।

  • মোবাইলের ওয়ালপেপারে আল্লাহর নাম দেওয়া যাবে?

    মোবাইলের ওয়ালপেপারে আল্লাহর নাম দেওয়া যাবে?

    ধর্ম  ডেস্ক:   প্রশ্ন: ফোনের ওয়ালপেপারে আল্লাহ তায়ালার নাম, বা কুরআন মাজিদের কোনো আয়াত দেওয়া যাবে কি ? সেটা সরাসরি আরবিতে না হয়ে বাংলা বা ইংরেজিতে অনুবাদ যদি হয় তবেও কোনো সমস্যা কি?

    আর যদি এমন অবমাননার আশঙ্কা থাকে, তাহলে এমন কোনো ওয়ালপেপার ব্যবহার করাই উচিৎ নয়, যাতে আল্লাহর নাম, কুরআনের আয়াত বা কাবা শরীফের ছবি থাকে।বাংলা বা ইংরেজি অনুবাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

    কুরআনের আয়াত, হাদিস বা আল্লাহর নাম ইত্যাদি সম্মানিত কোনো লেখা দৃশ্যমান অবস্থায় টয়লেটে নিয়ে যাওয়া নাজায়েজ। লেখা দৃশ্যমান না হলে সমস্যা নেই। বর্তমানে অনেকের মোবাইলে কুরআন পড়ার অ্যাপ থাকে বা কুরআন তিলাওয়াতের অডিও থাকে। মোবাইলে এ রকম কুরআন থাকলে তা যদি দৃশ্যমান না থাকে, তাহলে ওই মোবাইল নিয়ে টয়লেটে যাওয়া নাজায়েজ হবে না।

    একইভাবে কুরআনের আয়াত, হাদিস লেখা কাগজ ভাজ করা অবস্থায় পকেটে থাকলে যেহেতু লেখা দৃশ্যমান থাকে না, তাই এ অবস্থায় টয়লেটে যাওয়া নাজায়েজ হবে না।তবে সব ক্ষেত্রেই সুযোগ থাকলে এ সব জিনিস টয়লেটে না নিয়ে যাওয়াই ‍উত্তম।